Advertisement
মেটাবলিজমের রহস্য এবং সুস্থ থাকার চাবিকাঠি!
শীতকাল তার নিজস্ব আকর্ষণ নিয়ে আসে—কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল, মিষ্টি রোদ, এবং সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই জাঁকিয়ে বসা কনকনে ঠাণ্ডা। দিন এত ছোট হয়ে আসে যে, রাত ৭টা বা ৮টা বাজতেই মনে হয় যেন মধ্যরাত! এই দীর্ঘ রাতের চক্রই প্রায়শই আমাদের রাতের খাবারের সময়কে পিছিয়ে দেয়।
আমরা প্রায়ই কম্বল মুড়ি দিয়ে সিনেমা দেখতে দেখতে বা গল্প করতে করতে রাতের খাবারের সময় রাত ১০টা বা ১১টা পার করে ফেলি। কিন্তু আপনি কি জানেন? শীতে আপনার সামগ্রিক সুস্থতা অনেকটাই নির্ভর করে কখন আপনি রাতের খাবার খাচ্ছেন তার উপর। বিজ্ঞানীরা পরামর্শ দেন যে, অপেক্ষাকৃত আগে রাতের খাবার খেলে শরীর ও মন দুটোই সতেজ থাকে। কিন্তু এর কারণ কী? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আপনার শরীরের ‘জৈবিক ঘড়ি’-র গভীর রহস্যে।
Advertisement
আসুন, বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে জেনে নিই তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খাওয়ার নিখুঁত কৌশল!
Advertisement
আপনার জৈবিক ঘড়ি এবং মেটাবলিজমের রহস্য
আমাদের শরীরের অভ্যন্তরে একটি প্রাকৃতিক পরিমাপ ব্যবস্থা রয়েছে, যা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বা জৈবিক ঘড়ি নামে পরিচিত। এই ঘড়িটি ঠিক করে আমরা কখন ঘুমাব, কখন শক্তি ব্যয় হবে এবং কখন আমাদের হজম শক্তি সবচেয়ে শক্তিশালী থাকবে।
Advertisement
সূর্যের আলো এবং মেটাবলিজমের সম্পর্ক
আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো, এই শরীরের ঘড়িটি সূর্যের আলোর সাথে সমন্বয় সাধন করে।
সূর্য ওঠার সময়: আমাদের শরীরের মেটাবলিক প্রক্রিয়া (হজম শক্তি) দ্রুত কাজ শুরু করে। আপনি তখন যা খান, শরীর দক্ষতার সাথে তা শক্তিতে রূপান্তরিত করে।
সূর্য ডুবে যাওয়ার পর: শীতে যেহেতু আলো দ্রুত শেষ হয়ে যায়, তাই আমাদের শরীরের মেটাবলিজমও তাড়াতাড়ি বিশ্রামের মোডে যেতে চায়। শরীর ধরে নেয় এখন বিশ্রামের সময়, কাজ করার নয়।
দেরিতে খাওয়ার ক্ষতিকর প্রভাব
এই সময়ে যদি আপনি রাত ১০টা বা ১১টায় একটি ভারী খাবার খান, তবে আপনার শরীরের হজম প্রক্রিয়া বিভ্রান্ত হয়ে যায়। যে খাবারটি শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার কথা ছিল, তা পরিপাকের জন্য শক্তি খরচ এড়াতে গিয়ে শরীর চর্বি হিসেবে সঞ্চয় করে রাখে।
ডেটা কী বলছে? ইনসুলিন ফ্যাট বার্ন এবং রোগের ঝুঁকি
বিজ্ঞানীরা শুধু তত্ত্ব দিচ্ছেন না, গবেষণা এর প্রমাণও দিয়েছে। খাবারের গুণগত মানের মতোই কখন খাচ্ছেন, তা-ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ব্লাড সুগারের মাত্রা: একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা রাত ১০টায় রাতের খাবার খেয়েছিলেন, পরের দিন সকালে তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা যারা সন্ধ্যা ৬টায় খেয়েছিলেন তাদের তুলনায় প্রায় ২০% বেশি ছিল।
ফ্যাট বার্নিং রেট: এছাড়াও, তাদের চর্বি পোড়ানোর হার ১০% কমে গিয়েছিল! উভয় দল একই পরিমাণে ক্যালোরি গ্রহণ করা সত্ত্বেও এই ফলাফল দেখা যায়।
ইনসুলিন সমস্যা: দেরিতে খাবার খেলে শরীরে ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদে, এই সমস্যা টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
সন্ধ্যা ৭টা বা ৮টা কেন আদর্শ সময়?
শক্তিশালী হজম: সন্ধ্যা ৭টার পরপরই আমাদের হজম শক্তি শক্তিশালী থাকে। এই সময়ে খেলে খাবার দ্রুত হজম নিশ্চিত হয়
অ্যাসিডিটি থেকে মুক্তি: গভীর রাতে খাবার খেলে অ্যাসিডিটি বা বুক জ্বালা হতে পারে, কারণ পাকস্থলী তখন আংশিক বিশ্রাম অবস্থায় থাকে।
তাড়াতাড়ি রাতের খাবারের অন্যান্য সুবিধা
তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেলে শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণই নয়, আরও অনেক সুবিধা পাওয়া যায়:
গভীর ঘুম: ভরা পেটে ঘুমাতে গেলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। শরীর খাবার হজম করতে ব্যস্ত থাকায় গভীর ঘুম হয় না। এর বিপরীতে, কিছুটা খালি পেট শরীরকে ঘুমের সময় নিজেকে মেরামত করার সুযোগ দেয়। আপনি সতেজ বোধ করে ঘুম থেকে উঠবেন।
মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি: শীতে কম সূর্যালোকের কারণে আমাদের মস্তিষ্কে সেরোটোনিন এর মাত্রা কমে যেতে পারে, যা ‘সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার’ এর দিকে নিয়ে যেতে পারে। সঠিক সময়ে খাবার শরীরের হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা মনের মেজাজকে প্রফুল্ল রাখে।
এই তিনটি সহজ টিপস অনুসরণ করুন
শীতের রাতে সুস্থ থাকতে এই তিনটি অভ্যাস গড়ে তুলুন:
খাবারের ধরন পরিবর্তন করুন: রাতে বিরিয়ানি বা ভারী খাবারের মতো সমৃদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলুন। স্যুপ, সবজি, রুটি বা হালকা সেদ্ধ/গ্রিলড খাবারের মতো হালকা বিকল্প চেষ্টা করুন। পুরোনো কথাটি মনে রাখবেন: সকালের নাস্তা রাজার মতো, দুপুরের খাবার রাজপুত্রের মতো এবং রাতের খাবার গরিবের মতো খান।
সময় নির্দিষ্ট রাখুন: প্রতিদিন একই সময়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন। একদিন সন্ধ্যা ৭টায় এবং পরের দিন রাত ১১টায় খেলে আপনার জৈবিক ঘড়ি বিভ্রান্ত হবে।
ঘুমানোর ২–৩ ঘণ্টা আগে খান: এটি মূল মন্ত্র। আপনি যখনই ঘুমাতে যান না কেন, সেই সময়ের ২–৩ ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করুন।
আপনার জন্য করণীয়
মনে রাখবেন, শীতের রাতে আরাম মানে শুধু কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমানো নয়; সঠিক সময়ে আপনার পেটকে আরাম দেওয়াও এর অংশ! আজ থেকেই আপনার রাতের খাবারের সময় পরিবর্তন করা শুরু করুন এবং দেখুন আপনার শরীর আরও বেশি বিশ্রাম অনুভব করে কিনা।
