Advertisement
ভূমিকা
বাসির মির্জা তার সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক জীবনই বাদাম বিক্রি করে কাটিয়েছেন। প্রতিদিন প্রায় বিকেল ৩টার দিকে তিনি ম্যানিক মিয়া এভিনিউতে, সংসদ ভবনের কাছে প্লেগ্রাউন্ডের সামনে তার মোবাইল স্টল বসান—ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা। প্রায় চার দশক ধরে এই ব্যবসা তাকে স্থায়ী আয় প্রদান করছে।
মির্জা, ৫৫, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ থেকে বলেন:
“বাদাম বিক্রির মাধ্যমে আমি আমার মেয়ের পড়াশোনা, তার বিয়ের খরচ এবং গ্রামে একটি ছোট জমি কিনতে পেরেছি।”
Advertisement
ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা
অন্যান্য বিক্রেতাদের মতো নয়, মির্জার ব্যবসা রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দা বা সামাজিক পরিবর্তনের মাঝেও স্থিতিশীল থাকে। বাদামের চাহিদা সবসময়ই আছে, শহর হোক বা দূরবর্তী গ্রাম।
Advertisement
একটি বৃদ্ধি পাচ্ছি নগদ ফসল
প্রোটিন, তেল ও ফাইবারে সমৃদ্ধ, বাদাম বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় নাস্তা। বিস্কুট, চকলেট, কেক, চানা চুর, বার এবং অন্যান্য মিষ্টান্নে খাদ্যপ্রক্রিয়াকারীরা এর ব্যবহার বাড়াচ্ছে, ফলে চাহিদা ক্রমবর্ধমান।
Advertisement
উৎপাদন তথ্য:
প্রায় ১৫ বছর আগে: ৪৫,০০০ টন
২০২৪–২৫ অর্থবছর: ১,৯৯,১০০ টন (ডিএইএর তথ্য অনুযায়ী)
উচ্চ চাহিদা কৃষকদের উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত করছে, এবং কৃষি বিজ্ঞানীরা উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করছেন।
কৃষকের সফলতার গল্প
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান আকন্দ, ইসলাপুর, জামালপুর:
“আমি শূন্য থেকে শুরু করেছি। এখন আমার শহরে ৫০ লাখ টাকার একটি বাড়ি এবং ৪–৫ বিঘা চর জমি আছে।”
নাজরুল ইসলাম, চিলমারী, কুড়িগ্রাম:
“বালি চর জমিতে অন্য কিছু ভালো হয় না, কিন্তু বাদাম আমাদের আশা জাগায়।”
নুরজামাল, কালিমাটি চর, লালমনিরহাট:
“আমরা উর্বরহীন জমিকে উত্পাদনশীল করেছি, এবং বাদাম আমাদের প্রধান আয় উৎস হয়ে উঠেছে। বাজারের দাম ভালো থাকলে বাদাম অন্যান্য ফসলের তুলনায় আরও লাভজনক।”
বাজারমূল্যের বৃদ্ধি
২০১১: ৬২ টাকা/কেজি
২০২৪: ১৬০ টাকা/কেজি
যেখানে কিছুই ভালো হয় না, সেখানে ফলছে
বাদাম মার্জিনাল জমিতেও, বিশেষ করে চর বা বালি দ্বীপে, ভালো হয়।
আবদুল্লাহ আল মামুন, ডেপুটি ডিরেক্টর, ডিএইএ কুড়িগ্রাম:
“বাদাম শুকনো, বালি এবং দো-সারের মতো মাটিতে ভালো ফলন দেয়।”
মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম মতিন, বারি:
“জমি পাওয়া যাচ্ছে এবং পরিবেশ উপযুক্ত হওয়ায় কৃষকরা উৎপাদন বাড়াচ্ছেন।”
প্রধান উৎপাদনকারী জেলা
লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর, নীলফামারী—উত্তরাঞ্চল দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন দেয়। মোট উৎপাদনের প্রায় ৯০% আসে ৬৫০টি চর জমি থেকে।
শিল্পে গুরুত্ব
বাদাম সস্তা, মিষ্টি এবং বহুমুখী হওয়ায় জনপ্রিয়।
বার্ষিক চাহিদা: প্রায় ১,৪০,০০০ টন
১০০,০০০ টন নাস্তা ও বেকারিতে ব্যবহার হয়
৩০,০০০–৪০,০০০ টন প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পণ্যে ব্যবহার হয়
পিআরএএন-আরএফএল গ্রুপ বছরে প্রায় ২,৫০০ টন ব্যবহার করে। স্থানীয় কৃষকরা বাজার দামের ওঠা সুবিধা পাওয়ার জন্য হারভেস্টের পর বিক্রি করেন।
Also read:হ্যারিসের ঝলক, পাকিস্তানের ৯৩ রানের জয় র বিরুদ্ধে
অপ্রয়োগিত সম্ভাবনা ও ভবিষ্যত
বাদামে ৪৮–৫২% তেল থাকে, যা সরিষা, সয়াবিন বা সূর্যমুখীর তুলনায় বেশি।
স্থানীয় জাত: ১,৮০০–২,০০০ কেজি/হেক্টর
উচ্চ ফলনশীল চীনা জাত: ২,৫০০–৩,০০০ কেজি/হেক্টর
কৃষকরা বলেন, ভালো সংরক্ষণ ও বিপণন থাকলে উৎপাদন আরও লাভজনক ও টেকসই হতে পারে।
বারি ইতিমধ্যেই ১২টি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে এবং শীঘ্রই ফসল পাকানোর জাত তৈরি করছে।
সিরাজুল ইসলাম, রংপুর ডিএই:
“বাদাম শুধু গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করে না, কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করে।”
উপসংহার
বাদাম বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করে এবং কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় প্রদান করে। উন্নত বীজ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তি থাকলে, এটি দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি সুযোগ হিসাবেও গড়ে উঠতে পারে।
