Advertisement
ঢাকা, বাংলাদেশের রাজধানী, নগর তাপ দ্বীপ (Urban Heat Island – UHI) প্রভাবের কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। বিশ্ব ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে, “An Unsustainable Life: The Impact of Heat on Health and the Economy of Bangladesh”, বলা হয়েছে যে গত ৪০ বছরে ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা দেশের গড়ের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে। ঢাকার তাপমাত্রা ১.৪°C বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে দেশের গড় বৃদ্ধি ১.১°C।
নগর তাপ দ্বীপ ধারণা এবং ঢাকা
যখন শহরগুলো আশেপাশের গ্রামাঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি গরম অনুভূত হয়, তখন তাকে নগর তাপ দ্বীপ বলা হয়। বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় “মনের মতো তাপমাত্রা” (feels like temperature) প্রকৃত বায়ুর চেয়ে ৪.৫°C বেশি। এখানে “মনের মতো তাপমাত্রা” বলতে বোঝানো হচ্ছে এমন তাপমাত্রা যা দেহ অনুভব করে, যা তাপ এবং আর্দ্রতার সমন্বয়।
Advertisement
বাংলাদেশ চার বছর আগে জাতীয় কুলিং প্ল্যান তৈরি করেছিল। তখন লক্ষ্য করা হয়েছিল যে, গত ২০ বছরে রাজধানীর তাপমাত্রা ১.৬°C বেড়েছে। ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ঢাকার গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৩°C থেকে বেড়ে ৩৪.৬°C হয়েছে।
Advertisement
কেন ঢাকা আরও গরম হচ্ছে
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ঢাকার UHI মূলত দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং পার্ক ও সবুজ এলাকার অভাবের কারণে হচ্ছে।
Advertisement
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ সোনিয়া অ্যাঞ্জেল এবং মেগান ওয়েইল লাটসচা বলেছেন, শহরগুলো তাদের নিজস্ব তাপ উৎপন্ন করে, যার ফলে আশেপাশের গ্রামাঞ্চলের তুলনায় ৪ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম হয়।
সোনিয়া অ্যাঞ্জেল বলেন:
“শহরগুলো আমাদের ঘর, গাড়ি, শক্তি ব্যবহার এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ড থেকে তাপ উৎপন্ন করে। এছাড়া, অধিকাংশ শহরে রাস্তা পাকা (অ্যাসফাল্ট) এবং কম গাছ আছে, যা তাপ ধরে রাখে এবং তাপমাত্রা বাড়ায়। এই প্রভাব ঢাকায় খুবই স্পষ্ট।”
নগর তাপ কমানোর উপায়
সোনিয়া জোর দিয়ে বলেছেন, নগর তাপ দ্বীপ একটি মানুষের তৈরি সমস্যা, এবং সমাধানও করা যায়:
- আরও বেশি গাছ ও উদ্ভিদ লাগানো
- কম অ্যাসফাল্ট এবং বেশি প্রতিফলকযোগ্য পদার্থ ব্যবহার করা
- শক্তি উৎপাদন ও ব্যবহার দক্ষভাবে করা
- ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায় চিহ্নিত করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা
এই পদক্ষেপগুলো শুধু তাপমাত্রা কমায় না, বরং শহরগুলোকে স্বাস্থ্যকর ও টেকসই করে তোলে।
স্বাস্থ্য প্রভাব
সোনিয়া অ্যাঞ্জেল বলেন, বাড়তে থাকা তাপমাত্রা ও খারাপ বায়ু মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে:
- স্ট্রোক বা হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি
- ফুসফুসের সমস্যা আরও খারাপ হওয়া
- ডায়াবেটিস ও মেটাবলিক সমস্যায় গুরুতর প্রভাব
- গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে জন্মগত সমস্যা ও অসুস্থ গর্ভধারণ
মেগান ওয়েইল লাটসচা বলেছেন, তাপ ও CO2-এর বৃদ্ধি খাদ্য এবং অ্যালার্জিক প্রভাবকে কিভাবে প্রভাবিত করে:
- কিছু হরব গরম এবং CO2-এর কারণে দ্রুত বৃদ্ধি পায়, কিন্তু প্রধান ফসলগুলো নয়
- অ্যালার্জি মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে
- তাপ বৃদ্ধি এবং মাটির শুষ্কতা পানির অভাব সৃষ্টি করে এবং কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়
- CO2 বৃদ্ধির কারণে উদ্ভিদ কম পুষ্টিকর হয়
Also read:নিউইয়র্কে এনসিপি নেতা আখতার হোসাইনকে হামলা: “আমরা ভয় পাই না”
নগর পরিকল্পনা এবং তাপ দ্বীপ
ঢাকার নগর পরিকল্পনাকারীরা কম সবুজ এবং বেশি অ্যাসফাল্টের এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন:
- ছাদ সবুজ করা
- গাছ লাগানো এবং পার্ক সংস্কার
- ছোট হ্রদ ও জলাশয় রক্ষা
- শহর পরিকল্পনায় বাতাস চলাচলের করিডোর খোলা রাখা
এই পদক্ষেপগুলো শহরকে ঠান্ডা রাখে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত করে।
খাদ্য নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
তাপ ও পানি ঘাটতি সরাসরি কৃষি প্রভাবিত করে। মেগান ওয়েইল লাটসচা বলেছেন:
“মাটির পানি বাষ্পীভবনের কারণে শুকিয়ে যায়, যা উদ্ভিদ রোপণে বাধা দেয়।”
ফসলের পুষ্টি ক্ষতি শহরে মানুষের পুষ্টিতেও প্রভাব ফেলে, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
ঢাকায় বসবাসকারীদের জন্য পরামর্শ
- গাছ লাগানো, পার্ক ও রূপমাঠ তৈরি করা
- প্রতিফলকযোগ্য বা জল শোষণযোগ্য পদার্থ ব্যবহার করা
- সোলার প্যানেল এবং কম শক্তি ব্যবহারকারী যন্ত্র ব্যবহার করা
- বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী ও অসুস্থদের জন্য কুলিং সেন্টার স্থাপন করা
- পানি ব্যবস্থাপনা: বৃষ্টি সংগ্রহ এবং মাটি আর্দ্র রাখা
সারসংক্ষেপ ও আহ্বান
ঢাকায় নগর তাপ দ্বীপ সমস্যা কেবল আবহাওয়া নয়, বরং স্বাস্থ্য, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করছে।
সোনিয়া অ্যাঞ্জেল এবং মেগান ওয়েইল লাটসচা বলেন, গাছ লাগানো, সবুজ এলাকা বৃদ্ধি, অ্যাসফাল্ট কমানো, শক্তি দক্ষভাবে ব্যবহার এবং ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায় সুরক্ষা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
শহরগুলোকে স্বাস্থ্যকর, টেকসই এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরোধক্ষম করতে এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া আবশ্যক।
