Advertisement
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা মানুষের বুদ্ধি এবং বিজ্ঞান উভয়কেই স্তম্ভিত করে দেয়। এমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের বেকার্সফিল্ড শহরে। সেখানে ৪১ বছর বয়সী এক নার্স এমন এক শিশুর জন্ম দিয়েছেন, যে জরায়ুর পরিবর্তে পেটের ভেতরে একটি ওভেরিয়ান সিস্টের আড়ালে বেড়ে উঠেছিল।
শিশুটির নাম রাখা হয়েছে রিও। চিকিৎসকদের মতে, এ ধরনের গর্ভধারণ এবং তার সফল সমাপ্তি দশ লাখে একটি ক্ষেত্রেও সম্ভব হয় না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে একটি ‘মেডিকেল মিরাকল’ বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের অলৌকিক ঘটনা হিসেবে অভিহিত করছেন এবং এটি আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নালগুলোতে প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
Advertisement
সিস্ট না কি গর্ভাবস্থা? একজন নার্সের বিস্ময়কর গল্প
শিশুটির মা ৪১ বছর বয়সী সু লোপেজ পেশায় একজন নার্স হওয়া সত্ত্বেও নিজের গর্ভাবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলেন। এ বছরের শুরুর দিকে যখন তার পেট বাড়তে শুরু করে, তখন তিনি ভেবেছিলেন এটি হয়তো তার পুরনো ওভেরিয়ান সিস্ট বা ডিম্বাশয়ের রসোলি বেড়ে যাওয়ার ফল।
Advertisement
মজার ব্যাপার হলো, সু গর্ভাবস্থার প্রথাগত লক্ষণগুলো যেমন সকালের অসুস্থতা, বমি বমি ভাব বা শিশুর নড়াচড়া অনুভব করেননি। তিনি এবং তার স্বামী অ্যান্ড্রু লোপেজ এটিকে কেবল একটি চিকিৎসা সংক্রান্ত জটিলতা হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু যখন পেটের ব্যথা এবং চাপ অসহ্য হয়ে ওঠে, তখন তারা ১০ কেজি ওজনের সেই সিস্টটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করার সিদ্ধান্ত নেন।
Advertisement
চাঞ্চল্যকর তথ্য: জরায়ু খালি কিন্তু পেটে সন্তান
অস্ত্রোপচারের আগে যখন রুটিন চেকআপ হিসেবে সিটি স্ক্যান এবং প্রেগন্যান্সি টেস্ট করা হয়, তখন তার ফলাফল সবাইকে স্তব্ধ করে দেয়। পরীক্ষার রিপোর্ট পজিটিভ আসে। পরবর্তীতে আল্ট্রাসাউন্ড এবং এমআরআই-এর মাধ্যমে যা উন্মোচিত হয় তা চিকিৎসা জগতের জন্য একটি বিশাল ধাক্কা ছিল:
১. খালি জরায়ু: সু-র জরায়ু বা গর্ভাশয় সম্পূর্ণ খালি ছিল।
২. পেটে গর্ভাবস্থা: শিশুটি লিভারের কাছে পেটের ভেতরে একটি এমনিওটিক থলিতে ছিল।
৩. বিরল অবস্থান: চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘অ্যাবডোমিনাল প্রেগন্যান্সি’ বলা হয়, যা এক অত্যন্ত বিরল এবং বিপজ্জনক ধরনের একটোপিক প্রেগন্যান্সি।
সিডার্স সিনাই হাসপাতালের মেডিকেল ডিরেক্টর ডক্টর জন ওজমেকের মতে, সাধারণত প্রতি ৩০,০০০ গর্ভাবস্থার মধ্যে মাত্র একটি ক্ষেত্রে ভ্রূণ জরায়ুর পরিবর্তে পেটে বিকশিত হয়, তবে সেটিকে পূর্ণ ৯ মাস পর্যন্ত বহন করা প্রায় অসম্ভব।
মৃত্যুর ছায়ায় জীবনের যাত্রা: একটি জটিল অস্ত্রোপচার
১৮ আগস্ট চিকিৎসকদের একটি বিশাল দল পূর্ণ অ্যানেস্থেশিয়ার অধীনে সু-র অস্ত্রোপচার করেন। এই অস্ত্রোপচার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল কারণ:
১. শিশুটি যে কোনো সময় অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারত।
২. টিউমারটি একটি বাস্কেটবলের আকারে বড় হয়ে গিয়েছিল।
৩. প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল একটি অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গের সাথে লেগে থাকায় মায়ের মৃত্যুঝুঁকি ছিল।
ভাগ্যক্রমে শিশুটি সরাসরি কোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের সাথে যুক্ত ছিল না বরং পেলভিসের কাছাকাছি ছিল। অস্ত্রোপচারের সময় সু প্রচুর রক্ত হারান, তবে চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিক রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। শেষ পর্যন্ত ৮ পাউন্ড ওজনের একটি সুস্থ পুত্রসন্তান রিও-র জন্ম হয় এবং টিউমারটি সফলভাবে অপসারণ করা হয়।
also read:কিশোরগঞ্জে স্কুল শিক্ষিকার ওপর বর্বরোচিত হামলা তিন বছরের শিশুকে তলাবে নিক্ষেপ
১৮ বছর পর ঘরে খুশির জোয়ার: মা-বাবার আবেগ
সু এবং অ্যান্ড্রুর জন্য রিও-র আগমন কোনো অলৌকিক ঘটনার চেয়ে কম নয়। বিয়ের ১৮ বছর পর এই অনন্য উপায়ে বাবা-মা হতে পেরে তারা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। রিও-র প্রথম বড়দিনের আগে অশ্রুসিক্ত নয়নে সু বলেন যে আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করি। ঈশ্বর আমাদের জীবনের সেরা উপহার দিয়েছেন। একজন নার্স হিসেবে আমি জানি যে আমাদের বেঁচে থাকাটা একটা অলৌকিক ঘটনা।
সাধারণ গর্ভাবস্থা বনাম সু লোপেজের ঘটনা
| বৈশিষ্ট্য | সাধারণ গর্ভাবস্থা | সু লোপেজের ঘটনা |
| অবস্থান | জরায়ু | পেটের গহ্বর |
| সফলতার হার | ৯৯ শতাংশ | ০.০০০১ শতাংশ (দশ লাখে এক) |
| লক্ষণ | স্পষ্ট (বমি, নড়াচড়া) | লুকানো (সিস্টের আড়ালে) |
| শিশুর ওজন | স্বাভাবিক | ৮ পাউন্ড (সুস্থ) |
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)
১. শিশু কি জরায়ুর বাইরে বেঁচে থাকতে পারে?
চিকিৎসাগতভাবে এটি অত্যন্ত কঠিন, তবে আধুনিক অস্ত্রোপচার এবং ভাগ্যের সহায়তায় শিশু বেঁচে থাকতে পারে, যেমনটি রিও-র ক্ষেত্রে ঘটেছে।
২. সু কেন বুঝতে পারেননি তিনি গর্ভবতী?
যেহেতু শিশুটি ওভেরিয়ান সিস্টের পেছনে এবং পেটের প্রাচীর থেকে দূরে ছিল, তাই তিনি শিশুর নড়াচড়া বা প্রথাগত লক্ষণগুলো অনুভব করতে পারেননি।
৩. এই শিশুটি কি এখন স্বাভাবিক?
হ্যাঁ, চিকিৎসকদের মতে রিও সম্পূর্ণ সুস্থ এবং একটি স্বাভাবিক শিশুর মতোই বেড়ে উঠছে।
সু লোপেজ এবং ছোট রিও-র গল্প আমাদের শেখায় যে জীবন যে কোনো পরিস্থিতিতে তার পথ খুঁজে নেয়। এই ঘটনা চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য গবেষণার একটি নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। এই অলৌকিক জন্ম সম্পর্কে আপনার মতামত কী? আপনি কি আগে কখনো এমন কোনো চিকিৎসা সংক্রান্ত গল্প শুনেছেন? কমেন্টে আপনার মতামত জানান এবং এই বিস্ময়কর খবরটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।
