Advertisement
ভূমিকা
নেপাল আবারও ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। চলতি মাসের শুরুতে যুবনেতৃত্বাধীন ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে সরকার পতন ঘটে, যার ফলে একটি নতুন অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। বড় প্রশ্ন হলো: এই নতুন দল কি জনগণের চাহিদা পূরণ করতে এবং দেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হবে?
অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রীদের শপথ
সোমবার রাজধানী কাঠমান্ডুতে প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেল তিন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীকে শপথবাক্য পাঠ করান। অগ্নিদগ্ধ প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনে খোলা আকাশের নিচে এই অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় এবং সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়।
Advertisement
নতুন মন্ত্রীরা:
Advertisement
- ওম প্রকাশ আর্যাল — স্বরাষ্ট্র, আইন, বিচার ও সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী
- কুলমান ঘিসিং — জ্বালানি, পরিবহন, অবকাঠামো ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রী
- রামেশ্বর খনাল — অর্থমন্ত্রী
Advertisement
পটভূমি: বিক্ষোভ ও অস্থিরতা
- শুরু: ৮ সেপ্টেম্বর, সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধতা আরোপ করলে ক্ষোভ ফেটে পড়ে। তরুণরা ডিসকর্ডসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আন্দোলন সংগঠিত করে।
- সহিংসতা: সংসদ ভবন ও বেশ কয়েকটি সরকারি দপ্তরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
- ক্ষয়ক্ষতি: অন্তত ৭২ জন নিহত ও ১৯১ জন আহত হয় — ২০০৮ সালে রাজতন্ত্র বিলুপ্তির পর এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ অস্থিরতা।
নতুন নেতৃত্ব: চমকপ্রদ প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি
সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি (৭৩) কে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি খোলাখুলিভাবে বলেন:
“আমার নাম এসেছে জনগণের আন্দোলন থেকে, আর আমি জেনারেশন জেড-এর দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে এগিয়ে যাব।”
তাঁর নিয়োগে প্রেসিডেন্ট পৌডেল ও সেনাপ্রধান অশোক রাজ সিগদেলের প্রভাব ছিল। একই সঙ্গে ডিসকর্ডে পরিচালিত তরুণদের অনলাইন জরিপেও তাঁকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
মূল মন্ত্রীরা ও তাঁদের ভূমিকা
ওম প্রকাশ আর্যাল – দুর্নীতিবিরোধী যোদ্ধা
- স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সুপরিচিত আইনজীবী।
- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দুর্নীতি দমন।
- জনগণের প্রত্যাশা: সৎ পুলিশিং, স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থা এবং শক্তিশালী দুর্নীতিবিরোধী আইন।
কুলমান ঘিসিং – জ্বালানি ও উন্নয়নের বিশেষজ্ঞ
- নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সাবেক নির্বাহী পরিচালক।
- দীর্ঘদিনের লোডশেডিং সংকট সমাধানের জন্য ব্যাপকভাবে প্রশংসিত।
- এখন তাঁর দায়িত্ব জ্বালানি, পরিবহন ও অবকাঠামো উন্নয়ন — যা অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে।
রামেশ্বর খনাল – অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কারিগর
- সাবেক অর্থসচিব ও খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ।
- ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের কঠিন দায়িত্ব তাঁর কাঁধে।
- বড় চ্যালেঞ্জ: যুব বেকারত্বের হার ২০% (বিশ্বব্যাংক) এবং মাথাপিছু আয় মাত্র ১,৪৪৭ মার্কিন ডলার।
- প্রত্যাশা: কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কার।
Also read:ইসরায়েলি হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানালো বাংলাদেশ
যুব আন্দোলন: “জেন জেড বিপ্লব”
এটি ছিল একেবারেই আলাদা ধরনের বিদ্রোহ — প্রযুক্তিনির্ভর, সুসংগঠিত এবং সম্পূর্ণ তরুণদের নেতৃত্বে।
- লাখ লাখ মানুষ ডিসকর্ড ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়।
- তাঁদের দাবিগুলো ছিল:
- দুর্নীতির অবসান
- সুশাসন
- অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভাকে এখনই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে:
- দুর্নীতি দমন কি সত্যিই কার্যকরভাবে হবে?
- বেকার তরুণরা কি অবশেষে চাকরি পাবে?
- দীর্ঘদিনের জ্বালানি ও অবকাঠামো পরিকল্পনা কি বাস্তবায়িত হবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে: যদি নতুন সরকার স্বচ্ছতা ও সংস্কারের মাধ্যমে সাফল্য দেখাতে পারে, তবে নেপাল একটি স্থিতিশীল অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। আর যদি ব্যর্থ হয়, তবে ক্ষোভ থেকে আরও বড় অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQs)
প্রশ্ন ১: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কতদিন থাকবে?
উত্তর: আগামী মার্চে নির্ধারিত নির্বাচনের আগ পর্যন্ত।
প্রশ্ন ২: কোন মন্ত্রী জনগণের সবচেয়ে বেশি সমর্থন পাচ্ছেন?
উত্তর: কুলমান ঘিসিং, কারণ তিনি দেশব্যাপী বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সমাধান করেছিলেন।
প্রশ্ন ৩: দুর্নীতি শেষ করা কি বাস্তবসম্মত?
উত্তর: সহজ নয়, তবে ওম প্রকাশ আর্যালের মতো কঠোর ব্যক্তিত্ব থাকায় আশা জাগে।
উপসংহার
নেপালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে জনগণের — বিশেষ করে “জেনারেশন জেড বিপ্লব” পরিচালনাকারী তরুণদের — প্রত্যাশা পূরণের বিশাল দায়িত্ব নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী কার্কি ও তাঁর দলকে প্রমাণ করতে হবে যে এটি কেবল অস্থায়ী পরিবর্তন নয়। যদি তারা দুর্নীতি দমন ও অর্থনীতি পুনর্গঠন করতে পারে, তবে এই সংকট নেপালের জন্য নতুন যুগের সূচনা হয়ে উঠতে পারে।
