Advertisement
ভূমিকা
বাংলাদেশ শিল্পোন্নয়নের পথে হাঁটছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীদের মনে বড় একটি প্রশ্ন ঘুরছে:
“আমাদের শিল্পায়নের স্বপ্নের সবচেয়ে বড় বাধা কি শেয়ারবাজার?”
বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলো শেয়ারবাজারের মাধ্যমে শিল্পকে শক্তিশালী করেছে। অথচ বাংলাদেশ এখনো মূলত ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের মধ্যে আবদ্ধ। এর ফলে আমাদের শেয়ারবাজার সীমিত, দুর্বল এবং অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে।
Advertisement
এই প্রবন্ধে তুলে ধরা হলো একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র:
Advertisement
- শিল্পায়নের জন্য শেয়ারবাজার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
- বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতি কী?
- কীভাবে বিনিয়োগকারীর আস্থা নষ্ট হলো?
- আইপিও সংকট, ফ্লোর প্রাইস ও বিনিয়োগকারীর ক্ষতির কারণ।
- এগিয়ে যেতে হলে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন?
শিল্পায়ন ও শেয়ারবাজার: বৈশ্বিক মডেল
আমেরিকা, চীন, ভারত, জাপান—সব বড় অর্থনীতি মূলধন বাজার ব্যবহার করেছে শিল্পের ভিত্তি মজবুত করতে।
Advertisement
- শেয়ারবাজার নতুন শিল্পকে “সস্তা মূলধন” দেয়।
- বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ ও মুনাফা পান, যা পুনর্বিনিয়োগে সহায়তা করে।
- ব্যাংকের ওপর চাপ কমে, অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আসে।
কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: সংখ্যায়
- নিবন্ধিত পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি: ৩,৭৭৭
- শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি: মাত্র ৩৯৭
- অর্থাৎ, মাত্র ১০% কোম্পানি শেয়ারবাজারে আছে।
এর মধ্যে বেশিরভাগই আর্থিকভাবে দুর্বল। প্রায় ২৪% কোম্পানি “জেড ক্যাটাগরি”-তে পড়ে, যারা নিয়মিত লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ।
আইপিও খরা: নতুন প্রাণের অভাব
আইপিও (Initial Public Offering) শেয়ারবাজারের “প্রাণরস” হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বাংলাদেশে—
- জুন ২০২৪ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানি সফলভাবে আইপিওর মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করতে পারেনি।
- গত এক দশক ধরে আইপিওর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
এর ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ারবাজারকে “মৃত বাজার” হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
ফ্লোর প্রাইস: বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
২০২২ সালে শেয়ারমূল্য পতন ঠেকাতে ফ্লোর প্রাইস নীতি চালু করা হয়। কিন্তু এর ফল হয়েছে উল্টো—
- লেনদেনের পরিমাণ ২,০০০ কোটি টাকা থেকে নেমে মাত্র ২০০ কোটিতে ঠেকে যায়।
- বিনিয়োগকারীরা ৬০–৭০% পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়েন।
- বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে সরে যেতে শুরু করেন।
এই সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীর আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
কেন ভেঙে পড়ল বিনিয়োগকারীর আস্থা?
- বিএসইসির বিতর্কিত সিদ্ধান্ত → অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
- আর্থিকভাবে দুর্বল কোম্পানি → বিনিয়োগকারীর বড় ক্ষতি হয়েছে।
- ব্যাংক খাতের দুর্নীতি → শেয়ারের দাম কমে গেছে।
- মিউচুয়াল ফান্ড ব্যর্থতা → “নিরাপদ” বিকল্পেও আস্থা ভেঙেছে।
বিদেশি বিনিয়োগের পতন
- ২০২৩ সালে বিদেশি BO অ্যাকাউন্ট: ৫৫,৫১২
- সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ: ৪৩,৮০১
- মাত্র দুই বছরে ১১,৭১১ অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে গেছে।
এখন বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে “অস্থির” বলে মনে করছেন।
স্থানীয় বিনিয়োগকারীর হতাশা: BO অ্যাকাউন্ট সংকট
- জুন ২০১৯-এ BO অ্যাকাউন্ট: ২৮.৪৫ লাখ
- ২০২৫-এ BO অ্যাকাউন্ট: ১৬.৫২ লাখ
ছয় বছরে প্রায় অর্ধেক বিনিয়োগকারী বাজার থেকে সরে গেছেন।
শিল্পায়নের ওপর সরাসরি প্রভাব
- নতুন শিল্প মূলধন পাচ্ছে না।
- ব্যাংক ঋণের চাপ বাড়ছে।
- ব্যবসায়ীরা শেয়ারবাজারকে উপেক্ষা করছে।
- দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের গতি দুর্বল হচ্ছে।
Also read:অপারেশন সিঁদুর: অজয় রায়ের মন্তব্যকে ঘিরে বিতর্ক | বিজেপির তীব্র সমালোচনা
সমাধান কী? (নীতিগত সুপারিশ)
- করপোরেট গভর্নেন্স শক্তিশালী করা।
- আর্থিকভাবে দুর্বল কোম্পানি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া।
- নিয়মকানুনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
- আইপিও প্রক্রিয়ায় সংস্কার আনা।
- নতুন কোম্পানিকে বাজারে প্রবেশে উৎসাহ দেওয়া।
- বিদেশি বিনিয়োগকারীর জন্য নীতিকে সহায়ক করা।
- ফ্লোর প্রাইসের মতো কৃত্রিম বাধা সরিয়ে ফেলা।
- ব্যাংক ও মিউচুয়াল ফান্ড খাত পুনর্গঠন করা।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: বাংলাদেশের শেয়ারবাজার কি সত্যিই শিল্পায়নের পথে বাধা?
উত্তর: হ্যাঁ, কারণ বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী উভয়ই ব্যাংক-নির্ভর, আর শেয়ারবাজার তার মূল ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ।
প্রশ্ন ২: আইপিও কেন থমকে গেছে?
উত্তর: বিনিয়োগকারীর আস্থা কমে যাওয়া, নিয়ন্ত্রক জটিলতা এবং বাজারের সুনাম নষ্ট হওয়ার কারণে।
প্রশ্ন ৩: বিদেশি বিনিয়োগ কি ফিরে আসবে?
উত্তর: হ্যাঁ, তবে শর্ত হলো—স্বচ্ছ নীতি, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব সংস্কার।
প্রশ্ন ৪: বিনিয়োগকারীরা কী করবেন?
উত্তর: আর্থিকভাবে শক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগ করুন এবং দীর্ঘমেয়াদি শেয়ার বা মিউচুয়াল ফান্ডে মনোযোগ দিন।
উপসংহার
বাংলাদেশের শেয়ারবাজার শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করার বদলে ধীর করে দিচ্ছে। দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত, আইপিওর ঘাটতি ও বিনিয়োগকারীর ভাঙা আস্থা—এসবই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদি এখনই প্রয়োজনীয় সংস্কার না করা হয়, তবে দেশের শিল্পোন্নয়নের স্বপ্ন বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
আহ্বান
আপনার কী মনে হয়?
বাংলাদেশ কি শক্তিশালী শেয়ারবাজার ছাড়া শিল্পোন্নয়নে এগোতে পারবে?
আপনার মতামত মন্তব্যে শেয়ার করুন এবং এই প্রবন্ধটি অন্যদের সঙ্গেও ভাগ করুন।
