Advertisement
জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখে বাংলাদেশ!
একটা সামান্য অসুস্থতা বা জ্বরের জন্য যখন তখন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া আপনার জীবনকে কতটা বড় বিপদের মুখে ফেলছে, তা কি আপনি জানেন? সম্প্রতি জাতীয়ভাবে পরিচালিত ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (-এর এক জরিপ বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক গুরুতর বিপদ সংকেত দিয়েছে।
এই জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট -এ ভর্তি হওয়া ৪১ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক আর কার্যকর থাকছে না! অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) নামে পরিচিত এই ভয়াবহ পরিস্থিতি এখন দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি প্রধান হুমকি।
Advertisement
জরিপের প্রধান তথ্য
অধ্যাপক ড. তাহমিনা শিরিন এবং অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন হাবিব (IEDCR) কর্তৃক উপস্থাপিত এই প্রতিবেদনটি এক বছরব্যাপী (জুলাই ২০২৪ থেকে জুন ২০২৫) কেস-ভিত্তিক পর্যবেক্ষণের ফল।
Advertisement
বিশাল ডেটা বিশ্লেষণ: জরিপে ৯৬,০০০ এরও বেশি রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
Advertisement
আইসিইউ রোগীর ঝুঁকি: পাঁচটি আইসিইউ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ৭১ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আইসিইউ রোগীর ক্ষেত্রে জীবনরক্ষাকারী ওষুধগুলি ব্যর্থ হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞের মতামত: অধ্যাপক হাবিবের মতে, ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ার প্রধান কারণ হলো অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ/অতিরিক্ত ব্যবহার। তাঁর জরুরি আহ্বান: “অ্যান্টিবায়োটিক বাঁচান, নিজেকে বাঁচান।“
অতিরিক্ত ব্যবহারে শীর্ষে ঢাকা: আঞ্চলিক বৈষম্য
জরিপে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বৈষম্য দেখা গেছে।
ঢাকায় সর্বোচ্চ ব্যবহার: জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের ৫৭ শতাংশই ব্যবহার হয় ঢাকায়। বিশেষায়িত হাসপাতালের উচ্চ সংখ্যা এবং রোগীর ভিড় এর মূল কারণ।
অন্যান্য বিভাগ: ঢাকার পরে রয়েছে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রংপুর এবং সিলেট বিভাগ।
ইউটিআই প্রবণতা: মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI)-এ আক্রান্ত রোগীদের মধ্যেও অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারের উচ্চ প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
দেশে সর্বাধিক ব্যবহৃত ১০টি অ্যান্টিবায়োটিক
IEDCR-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সর্বাধিক ব্যবহৃত ১০টি অ্যান্টিবায়োটিক নিচে দেওয়া হলো। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই ধরনের ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিকগুলির অতিব্যবহার পরিস্থিতি আরও খারাপ করবে।
এএমআর বৃদ্ধির মূল কারণ ও বৈশ্বিক হুমকি
অ্যান্টিবায়োটিকের এই প্রতিরোধ ক্ষমতা কেন বাড়ছে? বিশেষজ্ঞরা চারটি প্রাথমিক কারণ চিহ্নিত করেছেন:
ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া স্ব-চিকিৎসা: লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া। ২. অনিয়ন্ত্রিত বিক্রি: ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ফার্মেসিতে অবাধে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি। গবাদি পশুর ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার: পশুপালনে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, যা খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। ৪. দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা: অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ পর্যবেক্ষণে ত্রুটি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অগ্রাধিকারমূলক রেজিস্ট্যান্স
এই জনস্বাস্থ্য হুমকি একটি বৈশ্বিক উদ্বেগ। IEDCR জানাচ্ছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জীবাণুগুলোর বিরুদ্ধেও দ্রুত প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ছে।
কার্বাপেনেম–রেজিস্ট্যান্ট এন্টারোব্যাকটেরিয়াস (CRE): অনেক ক্ষেত্রে রেজিস্ট্যান্সের হার এখন ৫০–৭০%।
মেথিসিলিন–রেজিস্ট্যান্ট স্টেফাইলোকক্কাস অরিয়াস (MRSA): এর প্রতিরোধ ক্ষমতাও নিয়মিতভাবে বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞের সতর্কবাণী: যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না করা হয় তবে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণও মারাত্মক বা প্রাণঘাতী হতে পারে।
প্রতিরোধে আপনার ভূমিকা: করণীয় ও সচেতনতা
এএমআর সংকট মোকাবিলায় সরকার, চিকিৎসক এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
জনসাধারণের জন্য করণীয় টিপস:
প্রেসক্রিপশন ছাড়া নয়: ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কখনোই অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না।
Also Read:বাংলাদেশে শ্রমিক সমর্থন কম থাকলেও শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন অনুমোদিত
সম্পূর্ণ কোর্স শেষ করুন: অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করলে, দ্রুত সুস্থ বোধ করলেও পুরো কোর্সটি শেষ করুন। অসম্পূর্ণ কোর্স শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়াগুলোকে টিকে থাকার সুযোগ করে দেয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স(AMR) কী?
প্রশ্ন: অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স(AMR) কী? উত্তর: AMR বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ঘটে যখন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক এবং পরজীবী সময়ের সাথে সাথে ওষুধের কাছে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে এবং ওষুধগুলো তাদের হত্যা করতে বা তাদের বৃদ্ধি থামাতে ব্যর্থ হয়।
প্রশ্ন: অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের চিকিৎসা কঠিন কেন?
উত্তর: যখন কোনো সংক্রমণ অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী হয়, তখন প্রচলিত চিকিৎসা ব্যর্থ হয়। ফলে দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, চিকিৎসার খরচ বৃদ্ধি, হাসপাতালে বেশি দিন থাকা এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।
প্রশ্ন: সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?
উত্তর: IEDCR-এর মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় জরিপ প্রকাশ এবং সচেতনতা তৈরি প্রধান পদক্ষেপ। তবে, অ্যান্টিবায়োটিকের অবাধ বিক্রি রোধে কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা এবং পশুপালন খাতে সঠিক ব্যবহার নীতি নিশ্চিত করা জরুরি।
জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান
“IEDCR-এর এই জাতীয় সারসংক্ষেপটি আমাদের স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) আর দূরবর্তী কোনো বিপদ নয়, এটি আমাদের দোরগোড়ায় একটি বাস্তব জনস্বাস্থ্য সংকট। আইসিইউ-তে ৪১% রোগীর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক শক্তিহীন—এই তথ্যটি আমাদের গভীর উদ্বেগ এবং জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করে।”
