Friday, January 2, 2026
Homeট্রেন্ডিংবাংলাদেশে বাল্যবিবাহ: এখনও প্রতি দুই মেয়ের একজনের বিয়ে ১৮ বছরের আগে

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ: এখনও প্রতি দুই মেয়ের একজনের বিয়ে ১৮ বছরের আগে

Advertisement

ভূমিকা

দশকের পর দশক আইন, সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান এবং সামাজিক উন্নয়ন সত্ত্বেও বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার এখনও ভয়াবহভাবে বেশি। বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ বাল্যবিবাহপ্রবণ দেশ হলো বাংলাদেশ। বর্তমানে প্রতি দুই মেয়ের মধ্যে একজনের বিয়ে হয়ে যায় ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই।

২০২২ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে বাল্যবিবাহের হার কমছে, কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির সময় এই অগ্রগতি থমকে যায়। এতে বোঝা যায় সংস্কারগুলো কতটা নাজুক। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—শিক্ষা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সংস্কৃতিতে পরিবর্তন ছাড়া প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ সমস্যায় জর্জরিত হতে থাকবে।

Advertisement

বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান ও পরিসংখ্যান

  • বিশ্বে অষ্টম সর্বোচ্চ বাল্যবিবাহপ্রবণ দেশ।
  • এশিয়ায় সর্বাধিক।
  • বাংলাদেশে ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের ৫০.৫% এর বিয়ে ১৮ বছরের আগে হয়েছে (ইউনিসেফ, ২০২৫)।
  • প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মেয়ে শিশুর বিয়ে হয়, এর বড় অংশই বাংলাদেশে।

সময়ের সঙ্গে প্রবণতা

  • ২০২০: ৫৩% কন্যাশিশুর বিয়ে হয় ১৮ বছরের আগে।
  • ২০২২: মহামারির কারণে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫%-এ।
  • ২০২৫: কমে দাঁড়িয়েছে ৫০.৫%। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১% হ্রাস পাচ্ছে।

যদিও হার কমছে, তবুও অর্ধেক মেয়ে শিশুর অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া সমস্যার ভয়াবহতা প্রমাণ করে।

Advertisement

কেন বাল্যবিবাহ চলছে: মহামারির প্রভাব

  • স্কুল বন্ধ থাকায় মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ের প্রবণতা বেড়েছে।
  • অর্থনৈতিক মন্দায় অনেক পরিবার মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দায় হালকা করার চেষ্টা করেছে।
  • সংকটকালে সামাজিক প্রথা ও সংস্কার আরও শক্তিশালী হয়েছে।

কাঠামোগত কারণ

  • দারিদ্র্য ও বৈষম্য: অনেক পরিবার মনে করে বিয়ে দিলে অর্থনৈতিক চাপ কমবে।
  • বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
  • গ্রামীণ ও প্রথাগত সমাজে সংস্কৃতিগত গ্রহণযোগ্যতা।

স্বাস্থ্য ও মানসিক ঝুঁকি: বিশেষজ্ঞ মত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মমতাজ সুলতানা বলেন:

Advertisement

“একজন মেয়ের শরীর ও মন ১৮ বছর বয়সের আগে পুরোপুরি বিকশিত হয় না। অল্প বয়সে বিয়ে গর্ভধারণে জটিলতা, এমনকি মা ও শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, বাল্যবিবাহের কারণে অনেক মেয়ে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়। এর ফলে তাদের শিক্ষার সুযোগ কমে যায়, কর্মসংস্থানের সুযোগ হারায় এবং হতাশা, একাকিত্ব ও আত্মসম্মানবোধ কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

আইনি ফাঁকফোকর

আইনজীবী মো. ইমরাত হোসেন জানান:

  • “বিশেষ পরিস্থিতি” ধারা বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭-তে প্রায়ই অপব্যবহার করা হয়।
  • অভিভাবকরা আদালতের অনুমতি নিয়ে নাবালিকা মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেন, যা আইনের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।

তিনি কঠোর নজরদারি ও loophole বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেন।

সমাজে পরিবর্তন প্রয়োজন

জুরিস্টিকোর রিসার্চ এক্সিকিউটিভ সেলিনা আখতার বলেন:

“অগ্রগতির জন্য মেয়েদের শিক্ষা, ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তা দরকার। মানুষকে বুঝতে হবে বাল্যবিবাহ দীর্ঘমেয়াদে কতটা ক্ষতিকর।”

তিনি জোর দেন সচেতনতামূলক প্রচারণা, নারীর নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং এনজিওগুলোর অংশগ্রহণের ওপর।

Also Read:অর্থনৈতিক ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা বাড়াতে পারে

বর্তমান আইন

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ পুরোনো ১৯২৯ সালের আইন বাতিল করে কঠোর শাস্তি প্রবর্তন করেছে:

  • বাল্যবিবাহ আয়োজনকারীরা সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা জরিমানা।
  • অভিভাবকরা এতে জড়িত হলে সর্বোচ্চ ২.৫ বছর কারাদণ্ড বা ৫০,০০০ টাকা জরিমানা।
  • নাবালিকারা জড়িত হলে এক মাস আটক বা ৫০,০০০ টাকা জরিমানা।

বাল্যবিবাহের চেষ্টা বা ঘটনা জানাতে কল করুন:

  • ৯৯৯ (জাতীয় জরুরি সেবা)
  • ১০৯২১ (নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়)
  • ১০৯ (নারী বিষয়ক অধিদপ্তর)

সমাধানের উপায়

বিশেষজ্ঞ ও এনজিওগুলোর পরামর্শ:

  • মেয়েদের স্কুলে টিকিয়ে রাখতে বৃত্তি ও সামাজিক সহায়তা দেওয়া।
  • পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করা।
  • গ্রামে অভিভাবক ও সমাজকে সচেতন করতে প্রচারণা।
  • বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ।
  • মেয়েদের জন্য নিরাপদ স্থান তৈরি যেখানে তারা দক্ষতা অর্জন, আত্মবিশ্বাস বাড়ানো ও স্বাধীন হতে পারবে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: কেন বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ এত বেশি?
দারিদ্র্য, লিঙ্গ বৈষম্য, সংস্কৃতিগত প্রথা ও দুর্বল আইন প্রয়োগের কারণে।

প্রশ্ন ২: মহামারির পর বাল্যবিবাহের হার কি কমেছে?
হ্যাঁ, ২০২২ সালে ৫৫%-এ পৌঁছেছিল, তবে এখন ধীরে ধীরে কমছে। ২০২৫ সালে তা ৫০.৫%।

প্রশ্ন ৩: বাল্যবিবাহের স্বাস্থ্যঝুঁকি কী কী?
গর্ভধারণে জটিলতা, মা ও শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি, এবং গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।

প্রশ্ন ৪: বাল্যবিবাহ কোথায় রিপোর্ট করতে হবে?
৯৯৯, ১০৯২১ বা ১০৯ নম্বরে ফোন করে জানানো যাবে।

আহ্বান

বাল্যবিবাহ রোধে সমাজ, পরিবার, সরকার—সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। আপনার মতে কোনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—স্কুল, পরিবার, না সরকার? মন্তব্যে আপনার মতামত জানান।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সবচেয়ে বেশি পঠিত