Advertisement
ভূমিকা
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ (আইসিটি-২) আশুলিয়ার দেহদহন মামলার শুনানি অব্যাহত রেখেছে, যা ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঘটে যাওয়া অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। বুধবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ১৬ জন আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ হয়। এদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামও রয়েছেন।
এই বিচার দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। পুলিশি সহিংসতা ও প্রমাণ নষ্ট করার পরিকল্পিত প্রচেষ্টার করুণ বর্ণনা জনমনে নাড়া দিয়েছে। নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় দিন গুনছে, আর মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করছে—এই মামলা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
Advertisement
দ্বিতীয় দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ
সকাল ১১টায় তিন সদস্যের বিচারক প্যানেল শুনানি শুরু করেন:
Advertisement
- বিচারপতি নাজরুল ইসলাম চৌধুরী (আইসিটি-২ এর সভাপতি)
- অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাশিদ
- জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবির
এই দিনে আদালত:
Advertisement
- নিহত সাজ্জাদ হোসেন সাজলের পিতা খলিলুর রহমানের জেরা শেষ করে।
- জেরা শেষে নতুন সাক্ষীর বক্তব্য রেকর্ড করে।
রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে সাইমুম রেজা তালুকদার যুক্তি উপস্থাপন করেন, আর আসামিপক্ষ সাক্ষীদের বক্তব্য চ্যালেঞ্জ করে প্রশ্ন তোলে।
এর আগের দিনে শহীদ আস সোবহানের ভাই রেজওয়ানুল ইসলাম ও খলিলুর রহমানের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছিল, তবে সময় সংকটের কারণে সেদিন জেরা সম্পন্ন হয়নি।
আশুলিয়ার ঘটনা কী ছিল?
অভিযোগপত্র অনুযায়ী:
- ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুলি করে ছয়জন তরুণকে হত্যা করে।
- এরপর পরিকল্পিতভাবে প্রমাণ নষ্ট করার জন্য তাদের মরদেহ একটি পুলিশ ভ্যানে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
- প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নিহতদের একজন তখনও জীবিত ছিলেন, যখন তাকে পেট্রল ঢেলে আগুনে পোড়ানো হয়।
এই ভয়াবহ কাহিনিগুলোই মামলার মূল অভিযোগ।
অভিযোগ ও আইনি অগ্রগতি
- ২ জুলাই ২০২৫: ১৬ আসামি আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন গ্রহণ করে।
- ২১ আগস্ট ২০২৫: অভিযোগপত্র গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
- ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪: আইসিটিতে মামলাটি দায়ের হয়, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনের আওতায় মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ঘটনাগুলো পরিকল্পিত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং গণঅভ্যুত্থান দমন করার জন্য সংঘটিত।
আসামিদের প্রোফাইল
- প্রধান আসামি: সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম।
- কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা ও সহযোগী—যারা ঘটনাটি সংঘটনে ও প্রমাণ ধ্বংসে জড়িত ছিলেন।
- কেউ কারাগারে থাকলেও অনেকেই পলাতক, যাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য
প্রথম দুই দিনের সাক্ষ্যে উঠে আসে হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা:
- খলিলুর রহমান: ছেলে সাজ্জাদের মৃত্যু ও তার পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টার বর্ণনা দেন।
- রেজওয়ানুল ইসলাম: ভাই শহীদ আস সোবহানের নির্মম হত্যাকে “পুরো জাতির বিরুদ্ধে অপরাধ” বলে অভিহিত করেন।
এই সাক্ষ্যগুলো কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতির কথা নয়, বরং একটি বৃহত্তর দমননীতির প্রতিফলন।
আইন ও সমাজে গুরুত্ব
আশুলিয়া দেহদহন মামলার প্রভাব সুদূরপ্রসারী:
- বিচারের জন্য: প্রথমবারের মতো সাবেক সংসদ সদস্যকে মানবতাবিরোধী অপরাধে আসামি করা হয়েছে।
- ইতিহাসের জন্য: ভয়াবহ ঘটনাগুলো নথিবদ্ধ করার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রাজনৈতিক সহিংসতার মূল্য জানতে পারবে।
- মানবাধিকারের জন্য: আন্তর্জাতিক মহল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, বাংলাদেশ কি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী বিচার দিতে সক্ষম হয় কিনা।
বিশেষজ্ঞ মতামত
একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক বলেছেন:
“আশুলিয়া মামলা কেবল ১৬ আসামির বিচার নয়; এটি আইনের শাসনের প্রতি জনআস্থাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠারও একটি পরীক্ষা।”
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই মামলা পুলিশ সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
প্রশ্নোত্তর
Q1: আশুলিয়া মামলার প্রধান আসামি কারা?
১৬ জন, যাদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম ও কয়েকজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য আছেন।
Q2: আশুলিয়ার ঘটনায় কী ঘটেছিল?
গণঅভ্যুত্থানের সময় ছয়জন তরুণকে গুলি করে হত্যা করে পরে পুলিশ ভ্যানে আগুনে পোড়ানো হয়।
Q3: বর্তমানে বিচার কোন ধাপে রয়েছে?
সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা চলছে।
Q4: মামলাটির গুরুত্ব কী?
এটি একটি ঐতিহাসিক বিচার, যা রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জবাবদিহির আওতায় আনছে।
উপসংহার
আশুলিয়া দেহদহন মামলা কেবল একটি বিচার নয়, এটি বাংলাদেশের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার সক্ষমতার এক কঠিন পরীক্ষা। আরও সাক্ষী হাজির হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব তাকিয়ে আছে—বাংলাদেশ কি রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকারদের ন্যায়বিচার দিতে পারবে?
