Advertisement
ভূমিকা: বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় ঐতিহাসিক পরিবর্তন
বাংলাদেশ সরকার চট্টগ্রাম নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (NCT), লালদিয়া টার্মিনাল এবং পাঙ্গাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল (কেরানীগঞ্জ, ঢাকা) এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালের পরিচালনা বিদেশি অপারেটরদের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এসব চুক্তি সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের বন্দর খাতে একটি বড় অর্থনৈতিক সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে যা বিদেশি বিনিয়োগ, লজিস্টিক দক্ষতা এবং বাণিজ্য প্রবাহ বৃদ্ধি করবে।
মূল ঘোষণা: বৈশ্বিক অপারেটরদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি
ঢাকায় ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ERF) আয়োজিত এক সেমিনারে নৌপরিবহন সচিব মো. ইউসুফ বলেন “এই টার্মিনালগুলো ২৫ থেকে ৩০ বছরের জন্য বিদেশি কোম্পানির কাছে লিজ দেওয়া হবে আমরা আশা করছি ডিসেম্বরের মধ্যেই চুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্ন হবে।”
তিনি বলেন দেশের বাণিজ্য দ্রুত বাড়ছে তাই বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে ও ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে বিদেশি সহযোগিতা অপরিহার্য।
Advertisement
পটভূমি: চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত সমুদ্রবন্দর যা প্রতিদিন হাজার হাজার কনটেইনার সামলায় কিন্তু বর্তমানে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
Advertisement
| সমস্যা | বিবরণ |
|---|---|
| প্রবেশদ্বারের সংখ্যা | মোট ১৩টি গেট চালু আছে |
| স্ক্যানিং ব্যবস্থা | মাত্র ৬টি গেটে স্ক্যানার আছে, এর মধ্যে ৩ থেকে ৪টি প্রায় সময় নষ্ট থাকে |
সচিব ইউসুফ বলেন “এই অবস্থা টেকসই নয়। আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও বাইরের দক্ষতা প্রয়োজন।”
Advertisement
বিদেশি অপারেটর কারা
প্রাথমিকভাবে দুবাই-ভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে (DP World) সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অপারেটর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোম্পানিটি ইতোমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত ও শ্রীলঙ্কার প্রধান টার্মিনাল পরিচালনা করে।
অস্থায়ীভাবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মালিকানাধীন চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেডকে NCT টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ ছয় মাসের জন্য দেওয়া হয়েছে।
স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো
সচিব ইউসুফ বলেন “প্রয়োজনে এসব চুক্তির বিস্তারিত তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে যেন স্বচ্ছতা বজায় থাকে।”
এই উদ্যোগ সরকারের ই-অডিট ও গুড গভর্ন্যান্স কাঠামোর অংশ যা সরকারি প্রকল্পে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়েছে।
বন্দর সম্প্রসারণ লক্ষ্য: ভিশন ২০৩০
সেমিনারে ইউসুফ জানান “২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বছরে ৫.৩৬ মিলিয়ন টিইইউ (TEU) সামলানোর সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।”
এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন আধুনিক অবকাঠামো, স্বয়ংক্রিয় স্ক্যানিং ব্যবস্থা এবং দক্ষ অপারেটর। বিদেশি সহযোগিতা এই অগ্রগতিকে দ্রুততর করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
Also read:“রুপোর চামচ মুখে নিয়ে জন্ম!” — বলিউডে নেপোটিজম নিয়ে সোনাক্ষী সিনহার রসিক প্রতিক্রিয়া
সাইফ পাওয়ারটেকের মেয়াদ শেষ
দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড চট্টগ্রাম NCT টার্মিনাল পরিচালনা করেছিল।
তবে তাদের চুক্তি ২০২৫ সালের জুলাইয়ে শেষ হয় এবং তা নবায়ন করা হয়নি। সরকার এবার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়।
বৈশ্বিক উদাহরণ থেকে শিক্ষা
ভারত, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিদেশি অংশীদারিত্ব বন্দর কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এসব মডেল থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে অংশীদারিত্বের ফলে দক্ষতা বৃদ্ধি, জাহাজ চলাচলের সময় হ্রাস এবং রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ঘটে। বাংলাদেশও একইভাবে তার আঞ্চলিক লজিস্টিক অবস্থান উন্নত করতে চায়।
ERF সেমিনারের মূল বক্তব্য
ঢাকার পল্টনে অনুষ্ঠিত “মেরিটাইম ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগের সুযোগ” শীর্ষক সেমিনারে নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা অংশ নেন।
| বক্তা | পদবি | ভূমিকা |
|---|---|---|
| মো. ইউসুফ | নৌপরিবহন সচিব | প্রধান অতিথি |
| আজম জে. চৌধুরী | সভাপতি, বাংলাদেশ শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন | বিশেষ অতিথি |
| দৌলত আখতার | সভাপতি, ERF | সেশন চেয়ার |
| ড. জায়েদি সাত্তার | চেয়ারম্যান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (PRI) | মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক |
বক্তারা বলেন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব শুধু বন্দর আধুনিক করবে না বরং নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| হস্তান্তরিত টার্মিনাল | ৩টি প্রধান টার্মিনাল |
| চুক্তির মেয়াদ | ২৫ থেকে ৩০ বছর |
| ২০৩০ সালের লক্ষ্য | ৫.৩৬ মিলিয়ন টিইইউ |
| কার্যকর গেট | ১৩টির মধ্যে ৬টিতে স্ক্যানার, যার ৪টি প্রায় সময় অকেজো |
প্রত্যাশিত প্রভাব
যদি প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় তাহলে এর সম্ভাব্য সুফলগুলো হলো
| সুফল | বিবরণ |
|---|---|
| বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি | সরাসরি বৈদেশিক মূলধন প্রবাহ |
| বন্দর দক্ষতা বৃদ্ধি | দ্রুত আমদানি রপ্তানি প্রক্রিয়া |
| আঞ্চলিক সংযোগ | ভারত নেপাল ও ভূটানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ উন্নত হবে |
এই উদ্যোগ বাংলাদেশের ভিশন ২০৪১ লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যা দেশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে পরিণত করার পরিকল্পনা।
উপসংহার
বাংলাদেশের বিদেশি অপারেটরের হাতে বন্দর হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত একটি সাহসী ও অগ্রগামী পদক্ষেপ।
যদি স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা যায় তবে এটি দেশের বাণিজ্য ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে এবং বাংলাদেশকে বৈশ্বিক লজিস্টিক নেটওয়ার্কে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যাবে।
